Tamohan, Govt. of India Registration Number (PRGI) WBBEN/25/A1160, New Genaration Acclaimed Bengali Literary Research Journal (Language, Literature & Cultural Studies) & Independent Publication. Maynaguri, Jalpaiguri, West Bengal, India. Estd. 2023.

ফিরে পাওয়া জীবনে: নতুন এডভেঞ্চারের খোঁজে | বাবলু সাহা | পর্ব ৭

সুন্দর ছবির মত কাঠের তৈরী লজটি, প্রবেশ পথের মুখে, দু ধারে কেয়ারি করা বাগান এবং বড় বড় টবে অর্কিড এবং মরশুমি ফুলের গাছ লাগানো। পিটারকে অনুসরণ করে আমি প্রবেশ করলাম লজের ভিতরে, ঘরের ভিতরের বামদিকে খাবার চেয়ার টেবিল পাতা, ডানদিকে ছোট্ট সাজানো গোছানো একটি বার, তার চারপাশে সুদৃশ্য পর্দা টানানো যাতে সুরুচির ছাপ স্পষ্ট।
আরেকটু এগোতেই ডানদিক দিয়ে সরু কাঠের সিঁড়ি উঠে গেছে উপরের দিকে, ঠিক তার নিচেই কাঠের দেয়াল দিয়ে তিনপাশ ঘেরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কিচেন, যেখানে লজের মহিলারা রান্নায় ব্যস্ত।

হঠাৎ আমাদের সাথে আলাপ পরিচয় করবার উদ্দেশ্যে লজের মালিক পেমু এসে সামনে দাঁড়াতেই চমকে গেলাম। কারণ আমরা ইলাম সদর বাজারের যে হোটেল বা লজে রাত্রিবাস করেছি, হুবহু সেই হোটেলের মালিক যেন আমাদের সামনে এসে উপস্থিত। আমার হতচকিত ভাব দেখেই পেমু অন্তর্যামীর মত হেসে ফেলে জানালো যে, আগের মালিক আর এই লজের মালিক পেমু আসলে দুই জুড়ুয়া ভাই।
এরপর কোথা থেকে কী উদ্দেশ্য করে এখানে ট্রেক করতে এসেছি জেনে, উনি দুতলায় আমাদের আজকের থাকার ঘরের অবস্থান বলে দিলেন। আমরা সোজা সিঁড়ি দিয়ে উঠে বাঁ হাতের একটি ডবল বেডের ছোট্ট ঘরে প্রবেশ করলাম।
ছোট হলেও একলহমায় ঘরটি আমার পছন্দ হয়ে গেলো। ঘরটির আকার অনেকটা ত্রিভুজাকৃতি, একটু ফারাকে পরিষ্কার দুটি সিঙ্গেল সাজানো খাট বিছানা বালিশ কম্বল। মাথার উপরে ওই ত্রিভুজ ঢালের ছাদ, ছাদের কিছুটা জায়গা কাচ দিয়ে ঘেরা, দিনের আলো প্রবেশ করার জন্য, চারপাশের দেওয়াল ঝকঝকে পালিশ করা জাপানী পাইন কাঠের।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর নিচে থেকে ডাক এলো দুপুরের আহারের জন্য। নীচে নেমে এসে খাবার টেবিলে বসতেই বিস্মিত হয়ে দেখলাম, কাঁসার বড় থালায় সরু চালের গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত বড় বাটির মাপে থালার মাঝখানে বসানো এবং থালার বাকি অংশের চারপাশে বেশ কয়েকরকম ভাজা, বিভিন্ন ধরণের সব্জি, আচার, আলাদা প্লেটে ডিমভাজা। আমরা গিয়ে পৌঁছেছিলাম একটু বেলা করে। তারমধ্যেই রান্না করে সাজিয়ে গুছিয়ে পাতে পরিবেশন। যাইহোক, খাওয়া দাওয়ার শেষে আমি সোজা চলে গেলাম লজের একেবারে ঠিক উল্টোদিকে, যেখানে বোর্ডে লেখা আছে, ওয়েটল্যান্ড রামসর সাইট, ইলাম। পাশেই লেকের ভিতরে প্রবেশ করার গেট, তারপাশে মাঈপোখোরী এলাকার ছোট্ট ম্যাপ এবং দিকনির্দেশ। যেহেতু এটি একটি পবিত্র হ্রদ বলে গণ্য, সেকারণে অনেকেই বাইরে থেকে এসে আলাদা আলাদা ঘাটগুলিতে ধুপ জ্বালিয়ে পুজো দেন (পুরোহিত ছাড়াই)।
এই হ্রদটির সাতদিকে মোট সাতটি ঘাট আছে।
এখানে বিশেষ তিথি উপলক্ষে বছরে দুটি মেলা বসে।  এই ওয়েটল্যান্ড ২০০৮ সালের ২৮শে অক্টোবর ওয়ার্ল্ড রামসর সাইট হিসেবে ঘোষিত হয়। এটি বৌদ্ধ এবং হিন্দুদের কাছে একটি পবিত্র তীর্থস্থান। লেকের জলের উপরিভাগে বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে বিভিন্ন ধরণের গাছ গাছালি, লেকের জলে প্রচুর বড় মাঝারি সাইজের রঙিন মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে চারপাশে এবং উপরিভাগে বৌদ্ধিস্ট রঙিন প্রেয়ার ফ্ল্যাগ টানানো আছে। বিভিন্ন প্রজাতির জীব বৈচিত্রের সমাহার এই লেকে। দুষ্প্রাপ্য স্যালামান্ডার, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও প্রজাপতি এবং রেড পান্ডার দেখা মেলে বিভিন্ন সময়ে। নানান ধরণের জড়িবুটি সমৃদ্ধ এখানকার জঙ্গল।
লেকের পাশ দিয়ে উপরে উঠলে অনেকটি জায়গা জুড়ে বোটানিক্যাল গার্ডেন, হর্টিকালচার, রক গার্ডেন এবং অর্কিড হাউস, যেখানে পূর্ব নেপালের বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা ভেষজ গুণসম্পন্ন নানান প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ছোট একটি গ্রীন হাউস যেগুলির ইকোলজি গুরুত্ব সম্পন্ন উদ্ভিদ সংরক্ষণ। বেশকিছুক্ষণ সেখানে কাটিয়ে, কয়েকটি ছবি তুলে আবার ফিরে এলাম পেমুর লজ বা হোটেলে। তখন প্রায় শেষ বিকেল। ভিতরে ঢুকে চেয়ারে বসতেই চা চলে এলো। খেয়েই বুঝলাম এই চায়ের অতুলনীয় স্বাদ। প্রশ্নের উত্তরে পেমু জানালো, এটি ইলাম টি গার্ডেনের সেই সুবিখ্যাত পাতা চা, যার মূল্য ৩,০০০ টাকা কেজি।

এরপর পেমু আমাদের পরিচয় করিয়ে দিল, ওর বিপুল মূল্যবান সংগ্রহ (এবং ওর ভালোবাসার ব্যবসা) বিভিন্ন ওষধি গুণসম্পন্ন গাছ গাছড়ার শিকড় বাকড় থেকে ওর নিজের হাতের তৈরী সব দুর্মূল্য জড়িবুটি। আলোচনা এগোতে থাকলো, কথাপ্রসঙ্গে পেমু মজা করে বললো, এরকম অনেক বিচ্ছিরি রাস্তার ট্রেকরুটে চলতে চলতে একসময় মনে হয়, ধুত্তর, এরকম বিচ্ছিরি রাস্তায় (সেইসাথে একটানা লম্বা হেঁটেই চলা) আর কখনও আসবোনা, কিন্তু আবার ট্রেক শেষে ঘরে ফিরেই বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নেওয়ার সময় সেইসব স্মৃতি রোমন্থন করতে বেশ আনন্দই লাগে, এবং সব ভুলে আবার আমরা রওনা দিই পরেরবারের লক্ষ্য উদ্দেশ্য করে (যদিও কোনবারই আমার তা মনে হয়নি)। এরপর পেমু বললো, পরের বার এলে আমি আমার পরিবার নিয়ে তোমাদের সাথে ট্রেক করতে যাবো হোটেল বন্ধ রেখে, এবং তোমাদের এই পথে আরও কিছু কঠিন নতুন রাস্তার সন্ধান দেবো একজন প্রকৃতি বা হিমালয় প্রেমিক বন্ধু হিসেবে ।

Comments

Popular Posts