ফিরে পাওয়া জীবনে: নতুন এডভেঞ্চারের খোঁজে | বাবলু সাহা | পর্ব ৫
প্রায় ৩-৪ কিলোমিটার সহজ পথে হাঁটার পর চৌরাস্তার মোড়ে ছোট্ট একটি বাজার এলো। এরপর পিটার একটি তাঁবু খাটানো খাবারের দোকানে ঢুকলো সকালের নাস্তা করার জন্য। দোকানটি মূলত নোনতা খাবারের। উনুনে গরম কচুরী সিঙ্গারা ভাজা হচ্ছে। আমরা কাঠের লম্বা টেবিলে বসে দু প্লেট সিঙ্গারা আর ঘুগনীর চাট নিলাম। খাওয়া হয়ে গেলে আবার নিলাম। এরপর দুজনে পেটপুরে খেয়ে খাবারের দাম মিটিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলাম। এবারে মজার ব্যাপারটি বলি, আমি প্রথম থেকেই যেহেতু হাঁটার জন্য খুব ছটফট করছিলাম, সেহেতু পিটার আমাকে এইপথটুকু কোনও শেয়ারের জিপে না এনে পুরো পথটাই হাঁটিয়ে এনেছিল। এরপর থেকেই ও আমাকে সোজা রাস্তায় না নিয়ে গিয়ে, অনেকটাই উল্টো বা ঘুরপথে নিয়ে চললো। এতে অবশ্য আমি খুবই লাভবান হয়েছিলাম কারণ আমাদের চলার পথ ছিল কণ্যম এর ঘন সবুজ চা বাগানের মধ্য দিয়ে। কণ্যম আরও বিখ্যাত কারণ, পাহাড়ের মধ্য দিয়ে, 'শ্রী অন্তু' থেকে তার অপূর্ব সূর্যোদয় দেখার জন্য বহু দেশী বিদেশী মানুষ বা ট্যুরিস্ট আসে এখানে।
এবার এই ইলাম জেলা সম্পর্কে খুব সংক্ষেপে কিছু তথ্য বলে নিই: এই ইলাম নামটি এসেছে, নেপালের লিম্বু ভাষায় 'ইল' অর্থ আঁকাবাঁকা এবং 'লাম' অর্থ রাস্তা। ইলাম সুবিখ্যাত ভেষজ উদ্ভিদ, অর্কিড, বিভিন্ন ধরণের বিরল পাখি, প্রজাপতি/মথ (একসময় কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারে গিয়ে হিমালয়ের উপরে বিভিন্ন দিক নিয়ে লেখা বই পড়তে গিয়ে হিমালয়ের প্রজাপতি/মথ সম্বন্ধে আগ্রহী হয়ে জানতে পেরেছিলাম, ইলাম এর রংবেরঙের প্রজাপতির কথা, যা শুধু ইলাম জেলাতেই বনে জঙ্গলে দেখতে পাওয়া যায় ), রেড পান্ডা এবং উৎকৃষ্ট মানের চায়ের কারণে। ইলাম এর চা ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। এবং ভারতেরও কিছু জায়গায় আসে। এই জেলায় মূলত যথাক্রমে- নেপালি, বানতাওয়া, লিম্বু, শেরপা, গুরুং, চামলিং, রাই, তামাং ও আরও কয়েকটি ছোট উপজাতির বাস।ফিরে আসি আমাদের চলার পথের বিবরণে।
বিশাল এলাকা জুড়ে চোখ জুড়ানো সবুজ চা বাগান, আমরা তারমধ্যে দিয়ে চলেছি, মহিলারা কাঁধে ঝুড়ি নিয়ে চা পাতা তুলতে ব্যস্ত, তাদের ছোট ছোট ফুটফুটে ছেলে মেয়েরা নিচের দিকে মাটিতে বসে নিজেদের মধ্যে খেলাধুলা আর খুনসুটিতে ব্যস্ত। আমি ক্যামেরা নিয়ে তাদের ছবি তুলছি দেখে, তারা সকলেই উঠে দাঁড়িয়ে দুহাত তুলে আনন্দের সাথে হৈ হৈ করে হাসিমুখে পোজ দিতে লাগলো (আমার আফসোস, সেবার ক্যামেরা খারাপ থাকায়, ছবি উঠলেও সামান্য আবছা হয়ে গিয়েছিল। যাই হোক, এভাবে চলতে চলতে একটি বাগানে একজন কর্মী অবাক চোখে আমাকে দেখে প্রশ্ন করলেন, আমি কী ট্রেক করতে ইলাম এ এসেছি? অবাক হওয়ার কারণ, এই রাস্তায় সচরাচর কোন ট্রেকারের দেখা পাওয়া যায়না। আমি তাকে বললাম যে হ্যাঁ, আমি এখানে ট্রেক করতেই এসেছি কলকাতা থেকে এবং ইলাম খুব সুন্দর জায়গা। একথা শুনে উনি খুব খুশি হয়ে আমাকে হাত নাড়লেন। এভাবে চলতে চলতে হঠাৎ চোখে পড়লো একটি পরিত্যক্ত টিনের চালাঘর। সেদিকে চোখ যেতেই পিটার আমাকে বলল, এটি কিছুদিন আগে সশস্ত্র মাওবাদীদের ঘাঁটি ছিল।
Comments
Post a Comment