TAMOHAN
Since 2023
A National Level Acclaimed Peer Reviewed Bengali Literary Research Journal
Executive Editor
Co-Editor
Tanay Mandal
Associate Editor
Production Editor
Sagnik Chakraborty
Youth Advisory Board
Ankita Karmakar, Anik Das, Debjyoti Neogi, Nilabhra Dey Sarkar, Suranjan Barman, Subham Routh
Senior Advisory Board
Shoumik Chakraborty, Subir Roy, Nishith Kumar Roy
Frequency
Yearly
RNI/PRGI
WBBEN/25/A1160
ISSN (Print)
3139-0889
Subject
Language, Literature & Culture
Publisher
Rishov Chakraborty, Tamohan Publishers, Ward No. 12, Debinagar, Maynaguri, Jalpaiguri, West Bengal, Pin Code 753224, India
Language
Bengali
Publication Format
Print

উত্তরবঙ্গের লোকনাটক : পালাটিয়া, আলকাপ ও খন গান | রুমি নাহা মজুমদার | প্রবন্ধ ৩

লোক সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য শাখা হল লোকনাটক। প্রকৃতপক্ষে লোকনাটক হল অ-বস্তুনির্ভর ভঙ্গিগত বাগাশ্রিত লোক সাহিত্যের একটি শাখা যার বিষয়বস্তু মৌখিক ও শ্রুতি নির্ভর সংলাপ ধর্মী। বাংলা বিভিন্ন অঞ্চলের লোক নাটকের মূলে আছে বিভিন্ন ব্রত লৌকিক অনুষ্ঠান। অর্থাৎ বলা যায় আনুষ্ঠানিক ব্রত গুলোই মূলত নাটকের প্রত্ন রূপ। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে যার নানাভাবে উত্তরন ঘটে। বিবর্তনশীল মানব সভ্যতার ইতিহাসে ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ক্রমাগত পরিবর্তনশীল। এই ধারায় সমগ্র বিশ্বজুড়ে প্রাচীন কাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত লোকনাটক বিভিন্ন আঙ্গিকে ধরা দিয়েছে। বিশ্বায়নের সাথে সাথে আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক,ভাষিক এবং নগরায়ন, দ্রুত শিল্পায়নের সাথে সাথে সাংস্কৃতিক জগতের পরিবর্তন ঘটে চলেছে যুগপৎ ভাবে। এর ফলে লোক নাটকেরও  পালাগুলোর বিষয় ও আঙ্গিকেরও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় । উত্তরবঙ্গের ভূমি রূপের বৈচিত্র্যের কারণে জলবায়ুর তারতম রয়েছে। আর এই বৈচিত্র্যের কারণে এখানে বহু ভাষাভাষীর মানুষ একত্রে মিলেমিশে বাস করে। এই মেলবন্ধনেই গড়ে উঠেছে মিশ্র ভাষার সংস্কৃতি। প্রাচীন কাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রতিনিয়ত এখানে জনসমাগম ঘটে চলেছে। উত্তরবঙ্গের ভূখণ্ড প্রতিবেশী দেশ নেপাল ভুটান বাংলাদেশ এবং প্রতিবেশী রাজ্য বিহার ও আসাম দ্বারা বেষ্টিত হওয়ায় সমাজ ভাষা সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে চলেছে অবিরত। তেমনি বিভিন্ন ধারার পরিবর্তন হয়ে চলেছে। এই পরিবর্তন প্রক্রিয়া সমাজ ও লোকসংস্কৃতির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে  জড়িত।

সৃষ্টির মুহূর্তে লোক নাটক ছিল ধর্মকেন্দ্রিক। তাই সৃষ্টির মুহূর্তে লোক নাটকের বিষয়বস্তু ছিল পুরান ও মঙ্গল কাব্য। সে ক্ষেত্রে সে সব কাহিনীকে বেছে নেওয়া হতো যেগুলোর মধ্যে ভাব ও গভীরতা লক্ষ্য করা যায়।এবং যার মাধ্যমে দর্শক ও শ্রোতার মনোরঞ্জন ও লোকশিক্ষা হয়। পূজা পার্বণের উপর ভিত্তি করেই লোক নাটকগুলি সৃষ্টি হলেও আমোদ প্রমোদ মূলক বা  আনুষ্ঠানিক রূপেই এর ক্রমবিকাশ ঘটতে থাকে। পরবর্তীতে কালের বিবর্তনে লোক নাটকে ধর্মকে ছাপিয়ে সাধারণ মানুষের সুখ দুঃখের কথাই বড় হয়ে ওঠে। এই ধরনের লোক নাটকের মধ্যে অন্যতম পালাটিয়া, গম্ভীরা, আলকাপ, ক্ষন, চোরর্চুন্নি, কুশাণ, নটুয়া প্রভৃতি। তবে পুরান ও মঙ্গলকাব্য নির্ভর লোক নাটক কখনোই ধর্মীয় আবেগ সর্বস্ব হয়ে ওঠেনি। বলা যায় এদের ধর্মীয় গোঁড়ামী এবং সাম্প্রদায়িকতার মনোভাব কখনো স্থান পায়নি, উল্টে হিন্দুর পাশাপাশি মুসলিম সম্প্রদায় জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সাধারন মানুষ সমস্ত বিনোদনে যোগ দিয়ে আনন্দে মেতেছে। বর্তমানে পুরাণের মোড়কে সমাজে নানা দিক তুলে ধরা হয়, যেখানে ন্যায়-নীতি বেশি প্রাধান্য পায়কিন্তু অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে মানুষের রুখে দাঁড়াবার সাথে সাথে কেবলমাত্র ন্যায়-নীতির আদর্শের দোহাই দিয়ে পৌরাণিক নাটক গুলো আর টিকে থাকতে পারল না মানুষের মনভাবের সাথে সাথে লোকানাট্যেও এলো  পরিবর্তন। সাধারণ মানুষ দেবদেবীর মাহাত্ম্য কীর্তনের বদলে নিজেদের জীবনের চাওয়া পাওয়া সুখ দুঃখের প্রতিবিম্ব দেখতে চাইলো। এভাবেই চাহিদা বাড়ল সামাজিক লোকনাটকের। ফলে লোকনাটকের বিবর্তন হল।

আর্থসামাজিক অবস্থার ধীরে ধীরে পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের রুচির পরিবর্তন হতে লাগলো তাই পুরান মঙ্গলকাব্যের একঘেয়েমি কাটাতে লোক নাটকের বিষয়ে উঠে আসলো সমাজ। সমাজের মানুষের চাওয়া পাওয়া নতুন করে রূপ পেল লোক নাটকে। তবে পৌরাণিক পালা একেবারে লুপ্ত হয়ে যায়নি। পৌরাণিক পালার মধ্য দিয়ে ন্যায়নীতি বোধ, বিচার ধর্মবুদ্ধি ইত্যাদি শেখানো হতে থাকে। তবুও তার মধ্যে সামাজিক ও অবিচারের বিরুদ্ধে সূক্ষ্ম প্রতিবাদ যখন থেকে দেখা যেতে লাগল, সামাজিক বিষয়বস্তুর পালা রচিত ও পরিবেশিত হতে লাগল তখন তার প্রতিবাদ অনেক স্পষ্ট সরাসরি ভাবে যুক্ত হতে থাকল। অর্থাৎ এসব কাহিনীর মধ্যে জনগণ নিজেদের প্রতিবিম্বই যেন দেখতে পায়। কাহিনী চরিত্রের সাথে তারা একাত্মতা অনুভব করে। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সামাজিক বিষয় হিসেবে স্থান পেতে লাগল অবৈধ প্রেম, পরকীয়া, সামাজিক কুৎসা ইত্যাদি। কিন্তু বর্তমানে এই ধারাতে রূপান্তর লক্ষ্য করা যায়। লোকনাটকে উঠে আসে রাজনৈতিক ঘটনাবলী। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রচার কাজে আসরে নেমে পড়ে লোক নাটকের দল। সংবাদ পরিবেশনের লোক নাটকের ভূমিকা অনন্য। তাই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এক্ষেত্রে সুবিধা গ্রহণ করে থাকে উৎস থেকে লোক নাটকগুলি আজ পর্যন্ত অনেক ভাঙ্গা গড়ার মধ্যে দিয়ে বহু পথ অতিক্রম করে চলেছে। অনিবার্যভাবে এইসব নাটকের মধ্যে এসেছে নানা রূপান্তর। স্থান ওকালের ভেদে লোক নাটক রূপান্তর দেখা যায় তা হল জলপাইগুড়ির পালাটিয়া, কোচবিহারের কুশান, মালদহের গম্ভীরা, উত্তর দক্ষিণ দিনাজপুরের খন, দার্জিলিং -এর নটুয়া এবং মুর্শিদাবাদের-আলকাপ। এসবের মধ্যে পালাটিয়া, খন ও আলকাপ নিয়ে আলোচনা করা যাক

পালাটিয়া : পালাটিয়া লোক নাটক জলপাইগুড়ি দার্জিলিং এর সমতল ভূমি ও উত্তর দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যাপক প্রচলিত। এটি আসলে প্রান্ত উত্তরবঙ্গের পাঁচালী গান। পাঁচালীর অপর নাম পালাটিয়া। এই গান সারারাত ধরে  অনুষ্ঠিত হয়। ধামগুলোতে অর্থাৎ দেবস্থানে ও পালাটিয়া উপস্থাপন করা হয় একে পালাগান বলা হয়ধাম ছাড়াও বিবাহ, অন্নপ্রাশন ইত্যাদি উপলক্ষে পালাটিয়া গানের আসর বসানো হয়। কুড়ি পঁচিশ জনের সদস্য নিয়ে পালাটিয়ার দল গঠিত হয়। দলকে যিনি পরিচালনা করেন তাকে বলা হয় হাঁদি। যিনি কাহিনী রচনা করেন তাকে বলা হয় ওস্তাদ। কোন কোন সময় এরা একই ব্যক্তি হতে পারেন। হাঁদি ওস্তাদের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে কাহিনী সংগ্রহ করেন। তবে ওস্তাদের কাছে মূল কাহিনী ও সংশ্লিষ্ট গানগুলো কেবল লিখিত থাকে। সেখানে চরিত্র অনুযায়ী সংলাপ লেখা থাকে না। এক্ষেত্রে কুশীলবেরা অভিনয় চলাকালীন আসরে উঠে তাৎক্ষণিকভাবে সংলাপ রচনা ও পরিবেশন করেন। অনেক সময় গৃহস্থের উঠোনেও পালাটিয়ার আসর বসে। আসর সাধারণত গোলাকার হয়। আসরে পাতা থাকে ত্রিপল। আসরের মাঝখানে বসেন কুশীলব ও বাদ্যযন্ত্রীরা। পালাগান পরিচালনা করেন হাঁদি তিনি বন্দনা দিয়ে গান শুরু করেন। এছাড়া থাকে দোহার ও ছুকরি। আগেকার দিনে পুরুষেরাই মেয়ে সেজে অভিনয় করত। তারাই ছুকরি।এখন নারী চরিত্রে নারীদের অভিনয় করতে দেখা যায়। খোলা মঞ্চেই পালাটিয়া অভিনীত হয়। জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলার অন্যতম প্রাচীন ঢাকের গান কে লোকনাট্যের পূর্বতন রূপ বলে মনে করা হয়পালা চলাকালীন অভিনেতারা বেশভূষা সজ্জিত হয়ে আসরেই বসে থাকেন। যার যখন অভিনয় তখন সে উঠে এসে সংলাপ বলে আবার গিয়ে বসে পড়েনগান গাওয়ার সময় একা একা গাওয়া হয় নাপ্রশ্নকর্তা ও উত্তর দাতা অর্থাৎ বক্তা শ্রোতা সব সকলেই  একসাথে গাইতে হয়।

বিষয়বস্তু অনুসারে তিন ধরনের পালাটিয়া দেখতে পাওয়া যায়

১. রং পাঁচাল : প্রেমই মুখ্য কাহিনী তবে সবটাই কাল্পনিক যা হাস্যরস ও রঙ্গ রসের মোড়কে উপস্থাপন করা হয়।

২. খাস পাঁচাল : এক্ষেত্রে কাহিনীতে সমাজের প্রতি শ্লেষ ও ব্যঙ্গ ই প্রাধান্য লাভ করে। এই পালা গানে অতীতে ঘটে যাওয়া কাছে দূরের কোন অঞ্চলের কলঙ্কজনক ঘটনা : যেমন অবৈধ প্রেম,  ব্যক্তিগত কুৎসা, অসামাজিক কর্ম ইত্যাদি ফাঁস করে দেওয়া হয়।

৩. মান পাঁচাল : পৌরানিক ও ঐতিহাসিক কাহিনী কে অবলম্বন করে রচিত হয় মান পাঁচাল।

পালাটিয়াতে অসামাজিক কাজকর্ম তুলে ধরার ফলে অনেক কিছু ফাঁস হয়ে যেতে থাকে এরপরে নির্দিষ্ট ব্যক্তি চরমহেনস্তার  মুখোমুখি হয় সমাজে। এরপরে চলে মামলা-মকাদ্দমা। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় গিল্টিমিঞা, ভেজালেশ্বরী, হ্যাজাক বাবু, মেন্টালের শ্বরী ইত্যাদি পালা। উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সমাজে দীর্ঘদিন ধরে ডাংগুয়া প্রথা, ঘরজেয়া প্রথা প্রথম পর্বে উঠে আসে। এরপরও উঠে আসে জমিদারি মহাজনি ব্যবস্থা কেবলমাত্র এর মধ্যে আবদ্ধ থাকে নিয়ে রাজনৈতিক বিষয়বস্তু এর পরে পালাটিয়াতে স্থান পেয়েছে তবে পালাটিয়ার মাধ্যমে পরিবার কল্যাণ জনশিক্ষা প্রসার, সমাজ সচেতনতামূলক বিষয়গুলির প্রচারকার্য চালানো সম্ভব হয়েছে। সেদিক থেকে পালাটিয়ার গুরুত্ব গঞ্জ এলাকায় যথেষ্ট।

আলকাপ : বাঙালি মুসলিম সমাজে নিজস্ব লোক সংগীত হলো আলকাপ। এটি মূলত মুর্শিদাবাদ মালদহে বেশি প্রচলিত। আলকাপকে  গান বলা হলেও এটি গান, কথা, ছড়া, নাটক ও নাচের একটি মিশ্রণ। আলকাপ এক প্রকার পালাগান বা তার বিকৃত রূপ। আলকাপ নামটি এসেছে উত্তরবঙ্গ থেকে আল অর্থাৎ প্রাচীন বাংলায় অর্থ হল রঙ্গরস। কাপের অর্থ হল কৌতুক নাটিকা অর্থাৎ রঙ্গ রসাত্মক নাটিকা। ১০-১২ জনের একটি দল রাতের বেলায় মঞ্চ বেঁধে আলকাপের আসর বসায়। জীবনের প্রেম সুখ দুঃখ পাওয়া না পাওয়া বিভিন্ন দিক আলকাপের বিষয়। তবে রাধা কৃষ্ণের পৌরাণিক কাহিনী আলকাপের আকর্ষণীয় বিষয়। আলকাপের প্রধান কে বলা হয় খলিফা বা সরকার সাথে থাকে হাস্য রসিক চরিত্র একজন তাকে বলে ভাঁড়। সাথে থাকে আরো দুজন পুরুষ তারা গানের সময় মেয়ে সেজে নাচ গান অভিনয় করে এবং দর্শক শ্রোতাদের আনন্দ দেয় এদের ছোকড়া ছুকড়ি বলে। তারা আলকাপের চটুল রঙ্গ রসিকতা অঙ্গভঙ্গি করে শরীরী আকর্ষণ তৈরি করে। আলকাপ গানে ঢোল, হারমোনিয়াম, ডুগডুগি, তবলা, খঞ্জনি, বাঁশি ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয়। গ্রাম্য জীবনের সহজ সরলতা এই গানের মূল বৈশিষ্ট্য। এক সময় এই গান মুসলিম সমাজে অনেক সমাদৃত হলেও আধুনিক সংস্কৃতি ও ধর্মীয় সমাজের চাপে আলকাপের প্রচলন প্রায় কমে আসছে।

খন গান : খন লোকনাটক অঘ্রাণ চৈত্র মাসে অর্থাৎ যে কোন অবসরে অভিনীত হলেও কিছু কিছু অঞ্চলে কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার দিন পালা অভিনীত হয় খন গান হচ্ছে উৎসবের গান, আনন্দের গান, অবসরের গান। অবিভক্ত উত্তর দক্ষিণ দিনাজপুরে বেশি পরিলক্ষিত হয়খন পালার বিষয়বস্তু সমাজের সংগঠিত বিভিন্ন ঘটনা থেকে নেওয়া হয়। তবে এক্ষেত্রে নারী পুরুষের প্রেমই মূল উপজীব্য। যেহেতু আঞ্চলিক অর্থে খণ হলো কেচ্ছা বা কাহিনী। তবে খন লোকনাটক শুধুমাত্র প্রেম প্রীতি তে আবদ্ধ থাকে নি। সমসাময়িক বিভিন্ন ঘটে  যাওয়া ঘটনা তুলে আনার পাশাপাশি অন্যায় অধর্মের বিরুদ্ধে নৈতিক বোধ জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তেভাগা খনটি ১৯৪৫- ৪৬ সালের তেভাগা আন্দোলনের পটভূমিকায় রচিত পরাধীন ভারতের জোতদার  বা জমিদার এবং সুদখোর মহাজনেরা কিভাবে দরিদ্র ভূমি কৃষকদের উপর অন্যায় অত্যাচার করত তার পরিচয় পাওয়া যায় এই খনে।

গাউন :   উচল খাল কাটি মাহাজুন 
                  জমি খান কনু বারো বোট
              ইখান জমি ও মাহাজুন 
                    আধি ছাড়াইস না মোর
           তোর মুই পা ধরুং মাহাজুন পা ধরং
                 পা ধরিয়া কহচুং মাহাজুন
             না করিম এনং কাম
                  তোর জমি ছাড়া ও মাহাজুন 
                        মুই কেনং করি খাম।

আবার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ন্যায় প্রতিষ্ঠা, সংস্কার রোধ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রভৃতি গণচেতনামূলক খনও রচিত হচ্ছে। এভাবেই প্রাচীন ঐতিহ্যগুলি বংশপরম্পরায় উত্তরবঙ্গের শিরায় শিরায় প্রবাহিত হয়ে চলছে। স্বাধীনতা পরবর্তী গণ আন্দোলন গুলি যেমন তেভাগা আন্দোলন, তিনবিঘা, বেরুবাড়ী আন্দোলন, কামতাপুর, গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন প্রভৃতি উত্তরবঙ্গের জনমানুষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। সমাজের অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে লোককবিরা প্রতিবাদ জানায় সামাজিক লোকনাট্যকে আশ্রয় করে। ব্রিটিশ রাজত্বকালে তাদের অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তুলে ধরেছিল লোকনাটকের মতো হাতিয়ার। কিন্তু স্বাধীনতার পরে বহু ক্ষেত্রে এই লোকবিদদের এই সংগ্রাম, সংগ্রামী মনোভাব অটুট থাকতে পারেনি। আর্থসামাজিক চাপে শাসক ও শোষণ যন্ত্রের কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হয় লোক নাটকের দলগুলো ক্রমেই তা শাসকদলের ক্রীড়ানকে পরিণত হয়।ভাষার ক্ষেত্রেও লোক নাটক গুলিতে যে ধরনের ভাষা ব্যবহারে প্রবণতা ও রীতি লক্ষ্য করা যায় তা আধুনিক লোকনাটক গুলিতে প্রায় পাওয়া যায় না। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে তারা আধুনিক জীবন সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত পালা গুলি বেশি পছন্দ করেন। আগেকার মত মানুষের হাতে এখন অত সময় নেই। কৃষি কাজের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের চা বাগানের ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে ওঠায় মানুষ এখন চাষআবাদ ছাড়া ও সেই সব দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ফলে সময় অভাবে তারা লোকনাটক রচনায় মনোনিবেশ করতে পারে না। তাই ধীরে ধীরে লোক নাটকের দলগুলো বসে যেতে থাকে। পরবর্তীতে গ্রামাঞ্চলে সিনেমা, যাত্রা, থিয়েটারের সর্বোপরি মোবাইল, টিভি, ইন্টারনেটের সর্বগ্রাসী প্রভাব লোকনাটকের সার্বিক রূপান্তরের জন্য এবং লুপ্ত হওয়ার জন্য দায়ী। কিন্তু সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের স্বার্থে এই লোক নাটকগুলো টিকিয়ে রাখা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে এর প্রচার-প্রসার করা সংস্কৃতিবান সকল মানুষের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে- একথা স্বীকার করে সকলে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

তথ্য সূত্র : শ্রী সনৎকুমার মিত্র সম্পাদিত বাংলা গ্রামীণ লোক নাটক, ডঃ দিলীপ কুমার দে সম্পাদিত : কোচবিহারের লোকসংস্কৃতি, ডঃ মৌসুমী দাস সম্পাদিত : উত্তরবঙ্গের লোকনাটক রূপ থেকে রূপান্তর।


Comments

Popular Posts