TAMOHAN
Since 2023
A National Level Acclaimed Peer Reviewed Bengali Literary Research Journal
Executive Editor
Co-Editor
Tanay Mandal
Associate Editor
Production Editor
Sagnik Chakraborty
Youth Advisory Board
Ankita Karmakar, Anik Das, Debjyoti Neogi, Nilabhra Dey Sarkar, Suranjan Barman, Subham Routh
Senior Advisory Board
Shoumik Chakraborty, Subir Roy, Nishith Kumar Roy
Frequency
Yearly
RNI/PRGI
WBBEN/25/A1160
ISSN (Print)
3139-0889
Subject
Language, Literature & Culture
Publisher
Rishov Chakraborty, Tamohan Publishers, Ward No. 12, Debinagar, Maynaguri, Jalpaiguri, West Bengal, Pin Code 753224, India
Language
Bengali
Publication Format
Print

কার মৃত্যু কে মরে | রানা জামান | গল্প ৪


অনেক হিসেব কষে চাকরিটা নিয়েছে জুবায়ের। জীবনবীমার মাঠ কর্মকর্তা। ওর স্থির বিশ্বাস ছিলো ভাই বোন আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব সকলেই একটা করে পলিসি কিনে নেবে। কিন্তু বন্ধুরা ওকে দেখলে চলে যায় আড়ালে; স্বজনরা ঘরে থেকেও জানায় ঘরে নেই। এমনকি আপন বড়ভাই আজ করবো না, কাল করবো বলে কাল ক্ষেপণ করছে! একমাত্র মা বিনা বাক্য ব্যয়ে পাঁচ হাজার টাকা প্রিমিয়ামে একটি জীবনবীমা পলিসি নিয়েছেন।

এই অকর্মণ্য জুবায়েরের একটা প্রেম আছে। - একটা বিয়ে বীমা করে ফেলেছে তিন বছর মেয়াদে! ওদিকে অফিস থেকে ওকে চাপ দেয়া হচ্ছে একটা মৃত্যুবীমা করার জন্য। মৃত্যুবীমার এককালীন প্রিমিয়াম পাঁচ লাখ টাকা। এই পলিসি নেবার ছয় মাসের মধ্যে মারা গেলে কোনো মুনাফা ছাড়া মূল টাকা ফেরৎ পাবে বীমা গ্রহণকারীর নমিনি। ছয়মাস পরে আত্মহত্যা ছাড়া যে কোনো দূর্ঘটনায় বা অসুস্থায় মারা গেলে নমিনি পাবে কুড়ি লাখ টাকা! এক বছরের মধ্যে মারা না গেলে ফের পাঁচ লাখ টাকার প্রিমিয়াম দিতে হবে। মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত এভাবে বার্ষিক প্রিমিয়াম দিয়ে যেতে হবে। কে করবে এমন বীমা?

ফের এগিয়ে এলেন মা। কিন্তু সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ালো ভাই-বোনেরা। এই বীমা করা মানে মায়ের মৃত্যু কামনা করা। কথাটা শোনে চমকে উঠে জুবায়ের কোনো প্রতিবাদ করতে পারলো না। মাও কেমন যেনো নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। বাড়ির পরিবেশ হয়ে গেলো থমথমে। যে যার কক্ষে চলে গেলেও জুবায়ের বসে রইলো ড্রয়িংরুমে। একটু পরে বাসা থেকে বেরিয়ে উঠে এলো ছাদে। আকাশে চাঁদ না থাকলেও তারা ভরা থাকায় বেশ আলো চারিদিকে। ছাদে বেশ বড় এক পাকা ছাতার নিচে পাকা চেয়ার পাতা আছে মাঝখানে একটা টেবিল ঘিরে। জুবায়ের একটা চেয়ারে বসে টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে বসে রইলো। কিছুক্ষণ পরে পিঠে হাত পড়ায় তাকিয়ে দেখলো মা।

মা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, মনে কষ্ট পেয়েছিস ওদের কথায়? আমি তো মানা করি নাই! আজ মারা না গেলেও দুই দিন পরে মারা যাবো। মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত। তোর বাবা চলে যাবার পর হতে এমনিতেই আমার আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে না। আত্মহত্যা মহাপাপ না হলে কবেই চলে যেতাম! শোন! আমি চুপিচুপি তোকে টাকাটা দেবো। তুই পলিসিটা কর্।

জুবায়ের মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ কেঁদে দিলো। মা' চোখ থেকেও ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু পড়তে থাকলো ছেলের মাথায়।

নায়লা বললো, কেমন বীমা? ছয় মাস পরে মরতে হবে! এই বীমা করতে বলো না আমাকে! আমার দুনিয়া দেখার অনেক বাকি। বাবা তোমার সাথে বিয়ে দিতে রাজি না হলে মা-বাবার পছন্দের পাত্রকে বিয়ে করে সংসারী হবো! কমপক্ষে দুই সন্তানের মা হবোই! দাদা নানি হওয়ারও ইচ্ছে আছে!

কী বলবে জুবায়ের? বুঝতে পারলো আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবদের দিয়ে এই বীমা পলিসি করানো যাবে না। এমন লোক খুঁজতে হবে যার টাকার খুব দরকার এবং মরণের পরোয়া করে না। কোথায় পাবে এমন বকরি? তখন ওর কথাটা মনে পড়লো: অন্তর লাগিয়ে খুঁজলে বাঘের চোখও পাওয়া যায়। হাঁটতে থাকলো জুবায়ের। হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যার সন্ধিক্ষণে রেলস্টেশনে উঠে এলো। গ্রাম এলাকার স্টেশনে এসময় কোনো ট্রেন আসার সময় না থাকায় কোনো লোকও থাকে না। স্টেশনের দুই প্রান্তে দুটো কম ভোল্টের বাল্ব জ্বলছে। ঘ্রাণটা নাকে লাগায় একবার নাক টেনে জুবায়ের মনে মনে বললো: এখানে গাঁজা টানছে কে? গাঁজা তামাক আর মদ কেউ না খেলেও গন্ধ শুঁকেই যে কেউ বুঝতে পারে জিনিসটা কী। ঘ্রাণ শুঁকতে শুঁকতে চলে এলো এক ঝোপের কাছে। ঝোপের আড়ালে কে যেনো বসে গাঁজা টানছে। ওকে দেখে লোকটা চমকে বা ভয় না পেয়ে টেনে যেতে থাকলো গাঁজা।

জুবায়ের লোকটার পাশে বসে বললো: আমারও মনটা খুব খারাপ। কিন্তু গাঁজা টানছে ইচ্ছে করছে না। গাঁজা খুব বাজে জিনিস।

লোকটা নাকেমুখে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললো, গাঁজা সহজলভ্য এবং দাম কম।

কী কষ্ট আপনার?

কী হবে আপনাকে বলে?

শুনেছি কষ্টের কথা কাউকে বললে মনটা হাল্কা হয়। আপনারটা বললে আমারটাও বলতাম আপনাকে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ। লোকটা ঘনঘন গাঁজা টেনে চারদিক অন্ধকার করে ফেলছে। তীব্র গন্ধ সইতে না পেরে জুবায়ের বাম হাতে নাক চেপে ধরলো।

জুবায়ের অপেক্ষা করছে। ওর বিশ্বাস: লোকটা কথা বলবে।

কিছুক্ষণ পরে কল্কিটা মাটিতে উপুর করে রেখে লোকটা বললো, প্রেম করে বিয়ে করেছি। অনেক ভালোবাসি রিনিকে। আমার তিন কূলে কেউ নেই। কাজেই বউকে মন লাগিয়ে ভালোবাসায় কোনো সমস্যা ছিলো না। ছয় মাস পর রিনির ঘন ঘন জ্বর আসতে থাকায় নিয়ে গেলাম ওকে হাসপাতালে। প্যারাসিটামলে জ্বর সারলেও দুই/তিন দিন পরে ফের জ্বর চলে আসে। একজন মেডিসিন স্পেশালিষ্টের কাছে নিয়ে গেলে বেশ কিছু টেস্ট করতে দিলেন। টেস্টে লিউকেমিয়া ধরা পড়লো। থার্ড স্টেজ হলেও ট্রিটমেণ্ট সম্ভব। অফিসের কলিগরা সাজেস্ট করলো বিলম্ব না করে ইন্ডিয়া নিয়ে যেতে। খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পারলাম কমপক্ষে কুড়ি লাখ টাকা নিয়ে যেতে হবে হাতে করে। পরে আরো খরচ আছে। কোথায় পাবো এতো টাকা আমি। বাবা-মা একমাত্র সন্তানের জন্য কিছু রেখে যেতে পারেন নি। আমার কোনো সঞ্চয়ও নেই। আমার অক্ষমতা এবং রিনিকে হারাচ্ছি, এই কষ্ট সাময়িক ভুলে থাকার জন্য গাঁজা টানি।

জুবায়ের খানিকটা হর্ষোৎফুল্ল কণ্ঠে বললো, আপনার সমস্যার সমাধান আছে আমার কাছে! কিন্তু এর আগে আপনার নামটা জানা দরকার।

লোকটি বললো, আমার নাম হাবীব, হাবীব হায়দার।

আপনার একটা ডেথ ইন্সুইরেন্স পলিসি নিতে হবে। পাঁচ লাখ টাকা প্রিমিয়াম। পেয়ে যাবেন কুড়ি লাখ টাকা!
ঝট করে হাবীব জুবায়েরের দিকে তাকিয়ে বললো, রিনির নামে?

না! মরতে পারে এমন রোগে আক্রান্ত রোগীর নামে ডেথ ইন্সুইরেন্স পলিসি কেনা যায় না!

তাহলে কার নামে?

আপনার নামে কিনতে হবে হাবীব ভাই।

তারপর?

ছয়মাস পরে আপনি মারা গেলে আপনার স্ত্রী চিকিৎসার জন্য পেয়ে যাবে কুড়ি লাখ টাকা।

কিভাবে মারা যাবো আমি? সুইসাইড করে?

উহু! সুইসাইড করলে কোনো ইন্সুইরেন্স ক্লেইম করা যাবে না! মৃত্যু হতে হবে এক্সিডেণ্টে অথবা রোগাক্রান্ত হয়ে।
তাহলে রিনির নামে পলিসি নিতে সমস্যা কোথায় ভাই? আপনার নামটা কী? আপনার সাথে ইন্সুইরেন্স পলিসি নিয়ে আলোচনা করছি কেনো?

আমার নাম জুবায়ের আলম। ইন্সুইরেন্স ফিল্ড অফিসার।

! আপনি আমাকে বলির বকরি বানাতে চাচ্ছেন! কোত্থেকে যে আসে এমন লোক!

বলতে বলতে কল্কি হাতে চলে গেলো হাবীব।

বেকুব বনে জুবায়ের তাকিয়ে রইলো অপসৃয়মান হাবীবের দিকে। মশার কামড় বেড়ে গেলো জুবায়ের চলে এলো বাড়িতে। ওর মাঝের উচ্ছলতা কেমন যেনো মিইয়ে যাচ্ছে। নিজ কক্ষে ঢুকে শুয়ে পড়লো বিছানায়।
মা এসে কপালে হাত দিয়ে চমকে উঠে বললেন, জ্বরে তোর গা পুড়ে যাচ্ছে! কোথায় ছিলে এতক্ষণ?

জুবায়ের ক্লান্ত কণ্ঠে বললো, বেশ কদিন ধরে একটু একটু গলা ব্যথা করছিলো আজ ব্যথাটা বেশ বেশিই করছে। একটু কুসুম গরম পানি দাও গরগরা করি। আর একটা প্যারাসিটামল দাও। ব্যথা জ্বর সেরে যাবে।

মা বললেন, নায়লা এসে বেশ কান্নাকাটি করে গেলো। তুই নাকি ফোন ধরছিস না? মেয়েটা তোকে পাগলের মতো ভালোবাসে। ওকে কষ্ট দিস না!

মা বেরিয়ে গেলেন কক্ষ থেকে। একটু পরে গরম পানি প্যারাসিটামল ট্যাবলেট নিয়ে এলেন। জুবায়ের গরম পানি দিয়ে কয়েকবার গরগরা করে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট খেয়ে কল দিলো নায়লাকে। অনেক ভালোবাসার কথা বলে ওকে শান্ত করে বললো আগামীকাল সকাল দশটায় সার্কিট হাউজের সামনে স্বাধীনতা চত্তরে আসতে।

পরদিন সকাল দশটা। স্বাধীনতা চত্তর। দু'জন কনক্রিটের ছাতার নিচে একটা বেঞ্চিতে বসে কথা বলছে।
নায়লা: তুমি এই চাকরি ছেড়ে দাও! চাকরি তোমাকে দিয়ে হবে না!

জুবায়ের: আমিও তাই ভাবছি। ভাবছি ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে রড-সিমেণ্টের দোকান দেবো।

তখন একটা লোক এসে ওদের সামনে দাঁড়ালে দু'জনেই ওর দিকে তাকালে লোকটি বললো, আপনাকে খুঁজে পেতে বেশ কষ্ট করতে হয়েছে আমাকে। উনি নিশ্চয়ই আপনার রিনি?

রিনি হতে যাবে কেনো!

বলেই থেমে গেলো জুবায়ের। ওর গতকাল সন্ধ্যায় হাবীব হায়দারের সঙ্গে কথাবার্তা মনে পড়ে যাওয়ায় বললো, আপনি হাবীব হায়দার! গতরাতে অন্ধকারে আপনার চেহারা দেখতে না পাওয়ায় চিনতে পারি নি। গতকাল আমাকে আজেবাজে বলে চলে গিয়েছিলেন; এখন এলেন কেনো? কিভাবে আমাকে খুঁজে পেলেন?

আপনার অফিসে গিয়েছিলাম। পলিসিটা করার জন্য আমি অফিস থেকে লোন নেবার ব্যবস্থা করেছি।
খুশির আতিশয্যে জুবায়ের হাবীবকে জড়িয়ে ধরলো।

বিস্মিত হয়ে নায়লা বললো, তোমার রড-সিমেণ্টের ব্যবসার কী হবে?

ওটা পরে হবে!

নায়লা গাল ফুলিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে বেরিয়ে গেলো স্বাধীনতা চত্তর থেকে। জুবায়ের মুচকি হেসে হাবীব হায়দারকে নিয়ে চলে এলো বীমা অফিসে। পাঁচ লাখ টাকা প্রিমিয়ামে হাবীব হায়দারের নামে হয়ে গেলো একটি ডেথ ইন্সুইরেন্স। নমিনি রিনি, রিনি হায়দার।

এই ইন্সুইরেন্স পলিসিটা করে হাবীব হায়দারের দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমে এসেছে। হাসপাতালে রিনির বেডের পাশে বসে রিনির হাত মুঠোয় ধরে আশ্বস্ত করে যে ছয় মাস পরে টাকাটা পেয়ে গেলেই ওকে ইন্ডিয়া নিয়ে যাওয়া হবে সুচিকিৎসার জন্য। কিন্তু ওর মৃত্যু কিভাবে হবে তা এখনো স্থির হয় নি। জুবায়ের কয়েকটা পদ্ধতির কথা বলেছিলো; কিন্তু ওর পছন্দ হয় নি। এই 'টা মাস রিনিকে খুব বেশি বেশি সময় দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাবীব। তাই এক সপ্তাহ পরে জুবায়েরের সাথে আলোচনা করে পদ্ধতিটা স্থির করে ফেলতে হবে।

এক সপ্তাহ পরে সকাল দশটায় স্বাধীনতা চত্তরে বসে দু'জনে অনেক তর্ক-বিতর্ক আলোচনা করে একটা পদ্ধতি স্থির করতে পারলো। হাবীব ট্রেনে চড়ে জুবায়েরের পকেট মারলে ওকে হাতেনাতে ধরে যাত্রীদের হাতে পিটুনি খাবার এক পর্যায়ে ধাক্কা দিয়ে ট্রেন থেকে ফেলে দিলেই কেল্লাফতে!

আজ 'মাস শেষ হচ্ছে। আগামীকাল জুবায়েরের সাথে আলোচনা করে ট্রেন সময় নির্ধারণ করতে হবে। এটা ভেবে মনটা খারাপ হয়ে যায়। অকালে ওকে চলে যেতে হবে! রিনির সাথে আজীবন ঘর-সংসারের অতৃপ্তি থেকে যাবে। কিন্তু রিনি বেঁচে যাবে। ওর জীবনের বিনিময়ে রিনির জীবন!

পরদিন। স্বাধীনতা চত্তরে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও জুবায়ের না আসায় ফোন করে জানতে পারলো জুবায়ের হাসপাতালে, ভীষণ অসুস্থ। হাসপাতালে এসে জানতে পারলো জুবায়েরের থ্রট ক্যান্সার হয়েছে; লাস্ট স্টেজ।
হাবীব হায়দারের কান্না পেলো খুব। জুবায়েরের হাত ধরে বললো, তুমি কি ডেথ ইন্সুইরেন্স পলিসি নিয়েছিলে?

জুবায়েরের মুখে অক্সিজেনের নল, চোখে অশ্রু। নেতিবাচক মাথা সামান্য নাড়লে হাবীব হায়দার ফের বললো, পলিসিটা নেয়া থাকলে তোমার ফ্যামিলি টাকাটা পেতো। কিন্তু আমার কী হবে এখন? ট্রেন থেকে এখন আমাকে ধাক্কা দেবে কে?

Comments

Popular Posts