ফিরে পাওয়া জীবনে: নতুন এডভেঞ্চারের খোঁজে | বাবলু সাহা | পর্ব ১১
চুপচাপ তন্ময় হয়ে বসেছিলাম, আমাদের চারপাশে শুধু সবুজ আর সবুজ, সামনেই বিশাল জলপ্রপাত এর সগর্জন আওয়াজ, আমরা দু - জন ছাড়া চতুর্পাশে অন্য কোনো দ্বিপদ মানুষের শব্দ নেই; আমরা এখানে একাই রাজা। কতক্ষণ বসেছিলাম হুঁশ নেই, হুঁশ ফিরলো পিটারের আওয়াজে, "বাবলুদা, এবার চলতে হবে।" এক ঝটকায় সম্বিৎ ফিরে উঠে দাঁড়ালাম, পিটার আবার আগের মত রেডী; ও চলতে শুরু করলো, বলতে গেলে, তখনই বুঝলাম যে, এবার শুরু হলো আমার আসল পরীক্ষা, কারণ আমরা মাইপোখরি থেকে যে রাস্তা ধরে টোরকে ঝর্ণার কাছে এসেছিলাম, সেই একই রাস্তা ধরে অনেকটাই সহজ পথ ছিল আমাদের আজকের পরবর্তী গন্তব্যে 'মাইমাজুয়া'। অনেক পরে সেটি জেনেছিলাম। কিন্তু, পিটার সেই তুলনামূলক সহজ প্রচলিত পথটি জানতো; এবং জানতো বলেই, আমার মত একজন গোঁয়ার সঙ্গী পেয়ে ওকেও বোধহয় এডভেঞ্চারের নেশায় পেয়ে বসেছিল। এবং হয়তো বা আমাকে আরও অনেক কঠিন বাধা পেরিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা যাচাই করে নেওয়ার জন্য। টোরকে ঝর্ণার বিপরীত মুখে আবার আমাদের হাঁটা শুরু হলো, বেশ কিছুটা পথ গভীর ঘন জঙ্গল ভেদ করে যাওয়ার সময় ডানপাশে পড়লো এক বিশাল লম্বা চওড়া খরস্রোতা পাহাড়ী নদী, একটু দূরেই তার উপরে মোটা বাঁশ কেটে তৈরী একটি বড় সাঁকো, স্থানীয় গ্রামের মানুষদের নদী পারাপারের জন্য। হঠাৎ দেখি আমাদের সামনে সহজ এবড়ো খেবড়ো একটু চওড়া রাস্তা। রাস্তার উপরে বিশাল বিশাল সাইজের পোষা জার্সি গরু চড়ে বেড়াচ্ছে। কয়েক কদম হাঁটার পর আচমকাই গতিপথ পরিবর্তন করে ডানদিকের খাড়াই পাহাড়ের গা বেয়ে সরু একফালি ওঠার জায়গা দিয়ে পিটার বেশ দ্রুতগতিতে উপরে চড়তে শুরু করলো। যথারীতি আমিও সেই একই গতিতে পিটারকে অনুসরণ করে চলতে থাকলাম। দেখতে দেখতে নীচের বড় রাস্তায় চড়ে বেড়ানো জার্সি গরুগুলো ছোট হতে ক্রমশঃ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিন্দু হয়ে মিলিয়ে গেলো। ডানদিকে নীচের দিকে তাকিয়ে দেখি, আমার দেখা সেই নদী একেবারে সরু ফিতের মত আকার ধারণ করেছে, বাঁশের সাঁকোটি দেখে এতটাই ছোট্ট লাগছে, যেন হাতের মুঠোয় অনায়াসে ধরা যাবে। এখন যে রাস্তা (জানিনা অবশ্য রাস্তার সংজ্ঞা ঠিক কাকে বলা ঠিক হবে!) ধরে তীব্র খাড়াই পথ ধরে উঠেই চলেছি, তার ডানদিকে যতদুর চোখ যায়, অতল মসৃণ গভীর খাদ, রাস্তা এমনই সরু যে, দুজন মানুষের পক্ষে একসাথে পাশাপাশি চলা সম্ভব নয়, পুরোটাই কাঁচা মসৃণ ঝুড়ো পাথরের এবং চলতে গিয়ে হঠাৎ করে দেহের ভারসাম্য বজায় রাখতে বাঁ হাত দিয়ে যে বাঁদিকের দেয়াল ধরবো সে উপায় নেই, কারণ ধরতে গেলেই স্তূপ হয়ে জমে থাকা ঝুরো মাটি আলগা হয়ে খুলে বেরিয়ে আসছে। মানে, ধরতে গেলেই খুলে এসে আমাকে সমেত মুহূর্তের মধ্যে ডানদিকের অতল খাদে ছিটকে ফেলে দেবে। প্রসঙ্গত এখানে একটি কথা বলে নিই যে, খুব উচ্চতায় পাহাড়ে চড়ার সময়, স্বাভাবিক নিয়ম হচ্ছে, নীচের দিকে একেবারেই তাকাতে নেই, কারণ তাহলে হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার সমুহ সম্ভাবনা। যদিও আমার সেসব বালাই নেই, পাহাড়ে যাওয়ার প্রথম শুরু থেকেই সে অভ্যেসটা রপ্ত করে ফেলেছি।
Comments
Post a Comment