ফিরে পাওয়া জীবনে: নতুন এডভেঞ্চারের খোঁজে | বাবলু সাহা | পর্ব ৯
এটি সিদ্ধ করা গাঁজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাজরা বা মিলেট থেকে তৈরি করা হয়। বাঁশের তৈরি একটি পাত্রে গাঁজন করা বাজরা রেখে তার উপরে ফুটন্ত জল ঢালা হয়। কিছুক্ষণ পর উষ্ণ অবস্থায় একটি বাঁশের সরু নল বা পাইপ দিয়ে ধীরে ধীরে পান করা হয়। এর স্বাদ টক মিষ্টি। লিম্বু সম্প্রদায়ের মধ্যে এটি খুবই জনপ্রিয় একটি পানীয়। এবার আসি একেবারে লোকাল মদ 'রক্সি' তৈরির পদ্ধতি নিয়ে। এর উপাদান চাল ও দেশী গাঁজনকারী উপাদান ফাপ। চাল বা কোদো বাজরা অর্থাৎ মিলেট ভালোভাবে সিদ্ধ করে ঠান্ডা করা হয়। এরপর ঠাণ্ডা ভাতের সাথে ফাপ ভালোভাবে মিশিয়ে মাটির পাত্রে বা বাঁশের চোঙায় রাখা হয়। এই মিশ্রণটিকে সাধারণত ৩-৭দিন গরম ও অন্ধকার স্থানে রাখা হয় গাঁজনের জন্য। এবার এই গাঁজন হওয়া মিশ্রণটিকে একটি বড় পাত্রে রেখে তার উপরে আরেকটি পাত্র বসিয়ে কাঠের চুলায় জ্বাল দেওয়া হয়। ভাপ বা বাষ্প হয়ে অ্যালকোহল ওপরের পত্রের গায়ে জমে নীচে এসে 'রক্সি' হিসেবে জমা হয়। তবে এই মদ অনিয়ন্ত্রিত ভাবে পান করলে শরীরে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। আরেকটি পানীয়ের খোঁজ পেয়েছিলাম সান্দাকফুর পথে কালপোখরীর একটি ছোট্ট কাঠের হোটেলে দুপুরের আহার করতে গিয়ে; খেতে বসে হঠাৎ লক্ষ্য করি, ঘরের একপাশে একটি বড় মোটা পলিজার ঢাকা দিয়ে রাখা আছে, কৌতূহলবশত কাছে গিয়ে ঢাকনা খুলতেই এমন একটি বিজাতীয় উৎকট গন্ধ বেরিয়ে এলো সেই তরল থেকে যে, সেইমুহূর্তে আমার খাওয়া মাথায় উঠলো। পরে শুনি সেটি ছিল লালি গুঁড়াসি বা রডোডেনড্রন ফুল বা তার রস গেঁজিয়ে তরী করা একপ্রকার স্থানীয় মদ।
যাই হোক, রাতে ডবল ডিমের কারী আর ভাত খেয়ে সোজা বিছানায় কম্বলের তলায়।পরেরদিন এক কাপ লবণ চা খেয়ে স্যাক গুছিয়ে কাঁধে তুলে আবার আমাদের হাঁটার রাস্তায়। এবারে আমাদের লক্ষ্য এশিয়ার দ্বিতীয় উচ্চতম ফলস্ 'টোরকে/টোর্কে' ঝর্ণা। সোজা রাস্তা ধরে বেশ অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিলাম, হঠাৎ সামনে দেখি জলের স্রোত বয়ে যাচ্ছে, পিছন ফিরে দেখি পিটার নেই। বুঝলাম যে হনহনিয়ে দ্রুত হাঁটার কারণে আমি একাই অনেকটা পথ ভুল করে এগিয়ে গিয়েছি। অগত্যা আবার পিছনের দিকে হাঁটা। কিছুটা পথ যেতেই সামনেই বাঁদিকে একটি ছোট ঘর, সেই বাড়ির মালিক আমাকে দেখে হাত ইশারা করে ঘরের লাগোয়া একটি সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতে বললেন। সেই দিকনির্দেশ লক্ষ্য করে সিঁড়ি দিয়ে নামতেই সামনে দেখলাম ঘণ জঙ্গল ভেদ করে পথ হুড়মুড়িয়ে একেবারে নিচের দিকে নেমে গেছে। আরও কিছুটা নামতেই সামনে দেখি পিটার আমার আসার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে।
আবারও সেই সরু সরু বাঁশের ছিপ লাঠির ঘণজঙ্গল ভেদ করে নামা। পিটার হঠাৎ বড় আর সামান্য মোটা আকারের একটি ছিপ লাঠি ব্যালেন্স ঠিক রাখার জন্য আমার হাতে ধরাতে গেলে, আমি প্রত্যাখ্যান করলাম কারণ, আজ অবধি পাহাড়ের বুকে যে কোনও রকম কঠিন ট্রেক করতে গেলে কখনও লাঠি বা ওয়াকিং স্টিক এর সাহায্য নিয়ে চলিনি, তো সে যতই না কেন চড়াই উৎরাই পথ হোক। এরকমভাবে নামতে নামতে হঠাৎ সামনে দেখি একটি বেশ লম্বা দৈর্ঘ্যের মোটা লোহার তারের ঝুলন্ত সেতু।
Comments
Post a Comment