ফিরে পাওয়া জীবনে: নতুন এডভেঞ্চারের খোঁজে | বাবলু সাহা | পর্ব ৮
পাঠকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, আগের পর্বে কিছু ভুল তথ্য পরিবেশনের জন্য, বা কিছু কথা লেখার না কারণে; যেমন: আমাকে যখন প্রথমদিন পেমুর হোটেলে (লজে) দুপুরের লাঞ্চ খেতে দেওয়া হয়, সেখানে খাবারের সাথে আরও ছিল, ডাল এবং গ্রীন স্যালাড। এরপর তো যথারীতি নিয়মে পাহাড়ের বুকে সন্ধ্যা নেমে এলো। দুপুরের দিকে যখন মাইপোখোরি এসে পৌঁছেছিলাম, তখন আমার সারা গা ঘামে ভিজে একাকার, হাঁটা শুরুর আগে গায়ের গরম পোশাক সব খুলে পিঠের পুরাতন রুকস্যাক এ ভরে নিয়েছি, লাল শৌখিন শহুরে জ্যাকেটটি গলায় বাঁধা।
এরপর বিকেল শেষ হয়ে যখন সন্ধ্যা নামলো, আস্তে আস্তে ঠান্ডা বাড়তে লাগলো এবং সেইসাথে হাওয়ার বেগ। অতএব আবার ঘরে গিয়ে সেই জ্যাকেট গায়ে চড়িয়ে নিচে এসে বসলাম চেয়ারে গা এলিয়ে। চতুর্দিকে শুনশান নীরবতা, বাইরে থেকে শুধু একটানা পাহাড়ী ঝিঁ ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে, কিচেন থেকে ঠুনঠান আওয়াজ আর মৃদুস্বরে কলতান।
পিটার উপরের ঘর থেকে বেরিয়ে নীচে নেমে এসে আমাকে একগাল হেসে বলে গেল,'বাবলুদা, আপনি আজকের সন্ধ্যাটা নিজের মত করে উপভোগ করুন, আমি পাশের বসার ঘরেই আছি। পাশের ঘরে বড় লম্বা চওড়া একটি টেবিল, চারপাশে কয়েকটি কাঠের চেয়ার বা স্টুল। সন্ধ্যা নামলে এই ঘরে এসে আশেপাশের হাতে গুণতি কয়েকজন পরিচিত মানুষ আসেন, টেবিলে যে যার ইচ্ছেমত পাহাড়ী মদ রক্সি বা লোকাল তৈরী দেশী বিয়ার ছাঙ নিয়ে বসে পড়েন, কোনও রকম হৈ চৈ নেই, হয়তো নিজেদের মধ্যে গুনগুন করে কথা বলা এবং মৌতাতে ডুবে যাওয়া। যাই হোক, পিটার পাশের ঘরে যাওয়ার পর আমি আমার মত করে বসলাম সেই ছোট্ট সাজানো গোছানো বার কাউন্টারের টেবিলে। পেমু এসে টেবিলে গ্লাস আর একটি প্লেটে ভর্তি করে কাজু সাজিয়ে দিয়ে গেল।
আমার প্রিয় পাঠকগণ এই অবধি পড়ে যদি ভেবে থাকেন যে, আমি বোধহয় এবারে নিশ্চিত কোন দামী স্কচ্ হুইস্কির বোতল খুলে বসবো! বিশেষ করে আমার পাশেই যেখানে সব বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ওয়াইন ইত্যাদির বোতল সাজানো। একেবারেই ভুল; আমি যখন বা যেদিন থেকে ট্রেক করে পাহাড়ে যাওয়া শুরু করেছি, তখন থেকেই আমার লক্ষ্য থাকতো, সেই স্থানের রুচি অনুযায়ী গ্রামবাসীদের বা স্থানীয় অধিবাসীদের তৈরী তাঁদের একেবারে নিজস্ব ঘরানার রান্নার স্বাদ গ্রহণ এবং তারা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় যেভাবে নিজেদের সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি নিয়ে অতিবাহিত করেন, আমি ঠিক সেটাই গ্রহণ করি তাদের সাথে মিশে। ফলে স্বাভাবিকভাবে মদ বা কান্ট্রি লিকারের বেলায় এর ব্যত্যয় ঘটবে কীভাবে?
অতএব, সেই নিয়মে (অর্থাৎ কিনা, যেখানে যেমন সেখানে তেমন) আমি আয়েশ করে এক বোতল পেমুর ঘরের তৈরী পদ্ধতিতে বানানো রক্সি নিয়ে বসলাম। এবারে রসিক আগ্রহী পাঠকদের জন্য পাহাড়ের অধিবাসীদের তৈরী তাঁদের নিজস্ব পাহাড়ী মদ নিয়ে কিছু তথ্য উপস্থাপনা করবো, যদিও যে বা যাঁরা হামেশাই দার্জিলিং, কালিম্পং, সিকিম, ডুয়ার্স, ভুটান এবং পূর্ব নেপালে যাতায়াত করে থাকেন, তাঁদের অধিকাংশের কাছেই এসব তথ্য অজানা না থাকারই কথা।
আমার নিজস্ব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে, নব্বইয়ের দশকে আমি যখন জীবনে প্রথমবার ছোট্ট ট্রেক করে পায়েখড়ি দিতে শুরু করি, তখন সবার প্রথমে গিয়েছিলাম শিলিগুড়ি - জোড়থাং হয়ে গাড়ি পাল্টে তারপর পায়ে হেঁটে পশ্চিম সিকিমের শেষ গ্রাম রিবধি - ভারেং হয়ে সান্দাকফু রুটের গোর্খে ট্রেকার্স হাটে। তো যাই হোক, সেইদিন সন্ধ্যায় গোর্খের একজন গ্রামবাসীকে সঙ্গী করে (সেসময় সেখানে একমাত্র থাকার (এবং খাওয়া) গোর্খে ট্রেকার্স হাট এবং সামনের উঁচু সিঁড়ি দিয়ে উঠলে, লুকোনো গ্রাম সামানদেন এ একটি প্রাইভেট হোম স্টে ছাড়া আর কিছুই ছিলনা), তার গ্রামের ঘরে যখন ঢুকলাম, তখন দেখলাম ঘরের মহিলা এবং পুরুষরা কিছু একটি বানানোর কাজে ব্যস্ত।
Comments
Post a Comment