ফিরে পাওয়া জীবনে: নতুন এডভেঞ্চারের খোঁজে | বাবলু সাহা | পর্ব ৬
ছবির মতো সাজানো বিস্তীর্ণ চা বাগানের মধ্যে দিয়ে সমতল রাস্তায় মনের আনন্দে পথ চলা। বেশ দ্রুতই হাঁটছি দুজনে। যেতে যেতে পিটারের মুখে নানা রকমের গল্প, পাখি চেনা, রং বাহারি প্রজাপতি, এখানকার নদী ইত্যাদি সম্পর্কে শুনতে শুনতে চলেছি। একসময়ে কলকাতার (ভারতীয়) জাতীয় গ্রন্থাগারে হিমালয়, তৎসংলগ্ন অঞ্চলের অধিবাসী বা উপজাতি, পাখি, জীববৈচিত্র্য ইত্যাদি সম্বন্ধে পড়াশোনা করার সময় জেনেছিলাম পূর্ব নেপালের এই ইলাম জেলার মথ এবং প্রজাপতি সম্বন্ধে। এর যথেষ্ট খ্যাতি আছে। এবার শুরু হলো ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে মাটির সরু রাস্তা। বস্তুতঃ এই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পায়ে হেঁটে চলার পথ ছাড়াও, মাঈপোখরি পৌঁছবার আরও একটি স্বল্প চওড়া রাস্তা আছে। সেপথ দিয়ে ইলাম বাজার থেকে মাইমাজুয়া লম্বা পথে সারাদিনে একটিই মাত্র শেয়ার জিপ যায়।
যেটি প্রতিদিন সকালে ছেড়ে বিকেলে গন্তব্যে পৌঁছে, আবার পরেরদিন সকালে ফিরতি যাত্রা করে। তিন - চারগুণ বেশি যাত্রী বা আরোহী নিয়ে এই গাড়িটির ভয়াবহ যাত্রার একটি ঘটনা নিজের চোখের সামনেই দেখেছিলাম। আমাদের চলার রাস্তায় জঙ্গলের পথ ছেড়ে, মাঝে মাঝেই খানিকটা সময় জঙ্গল থেকে বেরিয়ে গিয়ে প্রায় গা ঘেঁষে চলা অপরিসর মাটির এবড়ো খেবড়ো রাস্তার ধার দিয়েও চলতে হচ্ছিল এভাবে চলতে চলতে হঠাৎ যেন মাটি ফুঁড়ে একটি চলন্ত জিপের আওয়াজ ভেসে এলো, এবং কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখি, প্রায় ঘাড়ের কাছে একটি শেয়ার জিপ, যাতে সওয়ার আছে কতজন তা এককথায় নির্ধারণ করা খুবই মুশকিল। গাড়ির ভিতরের সিটে বেশিরভাগই মহিলা যাত্রী বসা, আর গাড়ির বাইরের বনেট, জানলা ইত্যাদি ধরে দাঁড়িয়ে বা অর্ধেক ঝুলে কোনও রকমে এক হাত দিয়ে ধরা অবস্থায়। হঠাৎ দেখি ওই জমাট ভিড় ভর্তি যাত্রী সমেত গাড়িটি চলতে চলতে রাস্তার একদিকে প্রায় হেলে পরে কাত হয়ে প্রায় মাটি ছুঁয়ে ফেলেছে। ভিতরের এবং বাইরের সমস্ত যাত্রী একেবারে হৈ হৈ হৈ হৈ হৈ করে উঠলো।
সেইমুহূর্তে গাড়ির নেপালী ড্রাইভার অসামান্য দক্ষতার সাথে ওই অবস্থায় ঠান্ডা মাথায় স্টিয়ারিং ধরে আবার সোজা দাঁড় করিয়ে দিলেন। গাড়ি আবার তার নিজের ছন্দে ওই এবড়ো খেবড়ো রাস্তা ধরে চলতে শুরু করলো। এরপর অবাক হয়ে দেখলাম, গাড়ির সমস্ত যাত্রীরা এ সম্পর্কে একেবারেই নির্বিকার, যেন এই পথে এরকম ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে, অর্থাৎ এটি যেন গা সওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। এরপর আমরা যে পথ ধরলাম, সে রাস্তায় শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল। এটি ছিল মাইপোখরি যাওয়ার শর্টকাট রাস্তা, সেটি গন্তব্যে পৌঁছানোর পর বুঝেছিলাম। যাই হোক, এভাবে বনের বড় বড় গাছের থেকে মাটিতে পড়ে থাকা শুকনো পাতার উপর দিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ সামনের দিকের রাস্তা একটু উঁচুতে উঠেছে শুড়ি পথে। সেই পথ ধরে কিছুটা উঠতেই লক্ষ্য করলাম, আমরা একটি বড় কাঠের দু-তলা সমান ঘরের একেবারে গা ঘেঁষে উপরে উঠতেই বড় রাস্তার উপরে পেমু হোটেল এন্ড লজ। তার ঠিক উল্টোদিকেই এখানকার পবিত্র হ্রদ মাইপোখরি।
Comments
Post a Comment